পরিবার পরিজন নিয়ে কক্সবাজার।

শামলাপুর মতান্তরে শাপলাপুর যাবার পথে তোলা। 

কক্সবাজার নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের সবচাইতে জনপ্রিয় ভ্রমন স্পট। ভ্রমনপ্রিয় এমন মানুষ খুজে পাওয়া দুশকর হবে যে একবারের জন্য হলেও কক্সবাজার ভ্রমন করেননি। আমি অনেক সময় মজা করে বলি প্রতিটা সামর্থবান মুসলিম যেমন জীবনে একবার হলেও মক্কা যায় ঠিক তেমনি সব বাংলাদশিও একবারের জন্য হলেও কক্সবাজার ভ্রমন করে। পৃথিবীর বৃহত্তম সমুদ্র সৈকতের মেরিন ড্রাইভ ধরে খোলা জিপ ধরে ছুটে চলার রোমাঞ্চকর আনন্দটা একবারের জন্য হলেও সবার পাওয়া উচিত।  

শামলাপুর- মাছ ধরার নৌকার সারি। 

আমরা সাতজন মেম্বার তিন রাত থাকার প্লান নিয়ে গিয়েছিলাম কক্সবাজার। যেহেতু শুক্র আর শনিবার ভ্রমন পিপাশুদের চাপ একটু বেশি থাকে তাই আমরা মঙ্গলবার রাতের গাড়িতে আমাদের যাত্রা শুরু করি । তিন দিনের ট্যুর প্লান আমরা আগেই করে ফেলি কবে কোথায় ঘুরব সেই সাথে কোথায় কত খরচ হতে পারে সেটার একটা আইডিয়া বাসা থেকেই খোজ খবর করেই বাজেট করেছিলাম। এতে আমাদের কক্সবাজার গিয়ে সময় ও খরচ দুটোই বেচে যায়।

শামলাপুর- ঝাউবন

আমার প্রথম দিনের প্লান ছিল, বাস থেকে নেমেই হোটেল ঠিক করা। যেহেতু বাস থেকে নামা আর হোটেল ঠিক করার পর হাতে সময় বেশি থাকবে না , সেক্ষেত্রে ঐ দিনটা আমরা শুধু আশেপাশের সাইটসিয়িং করে কাটাবো। যাই হোক, বাস থেকে কলাতলী ডলফিন মোড় নেমে হোটেল ঠিক করতে করতে প্রায় দুপুর একটা । এরপর হোটেল এ উঠে ফ্রেশ হয়ে সবাই মিলে চলে গেলাম কলাতলী বিচে গোসল করতে। গোসল শেষ করে হোটেল এ এসে ফ্রেস হয়ে একটা ছোট্ট ঘুম দিয়ে নিলাম। যেহেতু সারা রাতের জার্নিতে সবাই ক্লান্ত । ঘুম থেকে উঠে খাবার খেয়ে নিলাম, বলা যায় দুপুর আর রাতের খাবার একসাথেই খাওয়া। বাসে সারা রাস্তায় এটা সেটা খেয়ে সবারই পেট মোটামুটি ভরা ছিল। সন্ধার প্লান বার্মিজ মার্কেট ঘোরাঘুরি আর জোস্নার চাঁদ উপোভোগ ।  আমাদের কপাল একদিক থেকে ভালই বলতে হবে, এমন সময় গিয়েছি যখন আকাশে ছিল অর্ধ চাঁদ আর সাগরে ছিল বিশাল বিশাল বিশাল ঢেউ। সাধারনত শীতকালের ঢেউ গুলা তেমন বড় হয় না, কিন্তু সম্প্রতি ঘুর্নিঝড় তিতলীর প্রভাব তখন কিছুটা বিরাজমান ছিল। সমুদ্রের বিশাল বিশাল ঢেউ গুলা মনের আনন্দ অনেক গুনে বাড়িয়ে দেয়, সেইসাথে পয়সাও উসুল করে দেয় সমানুপাতিক হারে। 


শামলাপুর, মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা চলছে। তাই চলছে মেরামতের কাজ। 

প্লান অনুযায়ী দ্বিতীয় দিন সকাল ছয়টায় ঘুম থেকে উঠে চলে গেলাম কলাতলী ডলফিন মোড়ে। দরদাম করে খোলা জিপ ভাড়া করলাম ২৫০০ টাকায়, সকাল ৬ টা থেকে দুপুর ২টা ; এর চেয়ে বেশি সময় নিলে টাকাও বেশি দিতে হবে। চাইলে কম খরচে সিএনজি বা অটো রিক্সাতেও যাওয়া যায় তবে মেরিন ড্রাইভ ধরে খোলা জিপ ধরে ছুটে চলার মজা ভুলবার না।

শাপলাপুরে আমি। 

আমরা জোয়ার ভাটার সময় জেনে প্রথমে টার্গেট করলাম কলাতলী থেকে ৩৫কিমি দুরের গন্তব্য পাটুয়ারটেক যাব, ইনানী বীচের পরেই। খুব সুন্দর প্লেস , একপাশে টিলা জাতীয় পাহাড় আর আরেকদিকে বিশাল সাগর। এখানে প্রবালের সাথে ঢেউ গুলাও বিশাল। প্রথম দর্শনে অনেকটা সেন্ট মার্টিন এর মত মনে হয়। সকাল বেলা যাওয়াতে পর্যটকের কোন ভিড় ছিল না তাই নিরিবিলিতে বেশ কিছুটা সময় কাটানো গেল। ছবিও তুললাম সবাই মিলে। মূলত এই প্লেস টা সম্পর্কে এখনো পর্যটকদের কাছে ততটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। কক্সবাজার যারা ঘুরতে আসে ইনানি পর্যন্ত এসেই ঘুরে চলে যায়।

পাটুয়ারটেক 

পাটুয়ারটেক একঘন্টার মত কাটিয়ে সোজা শামলাপুর এর উদ্দেশ্যে। এখান থেকে মাত্র ১০কিমি রাস্তা। জিপে যাবার পথে একপাশে বিশাল সমুদ্র আর ঝাউবন, ইচ্ছা করে ঘর সংসার বাদ দিয়ে এখানেই পড়ে থাকি যতদিন মন চায়। শামলাপুর যাবার পথে দুজায়গায় গাড়ি থামিয়ে আর্মি আর পুলিশ চেক করে। একটু পরেই রহিঙ্গা ক্যাম্প আছে, তাই এত কড়াকড়ি। যাই হোক সব চেক পার হয়ে আমরা শামলাপুর বীচ এ পৌছুলাম সকাল নয়টা বাজার একটু আগে।

পাটুয়ারটেক, রাস্তা থেকে তোলা। 

শামলাপুর মুলত জেলে অধ্যুষিত এলাকা, গিয়ে দেখলাম প্রচুর জেলে নৌকা সারি দিয়ে রাখা আর চলছে মেরামতের কাজ। আমরা যখন গিয়েছিলাম তখন ইলিশ মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা চলছিল, তাই সব ট্রলার সারি বেধে রাখা। আমরা ওদিকে যাওয়ার পর সবাই আমাদের দিকে কৌতুহলী দৃষ্টি নিয়ে তাকাচ্ছিল, আমরাও ওদের সাথে কুশল বিনিময় করলাম। যেটা বুঝলাম, এদিকটাতে টুরিষ্ট আনাগোনা হয়ত কম। আমরা যখন শামলাপুর পোছুলাম তখন আস্তে আস্তে ভাটা নামছে। সমুদ্রের পানিও নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। একটা জিনিষ খেয়াল করলাম, কক্সবাজারের এক এক জায়গার বিচে এক এক রকমের ফ্লেভার।   

পাটুয়ারটেক- একাংশ

শামলাপুরের বৈশিষ্ট হল,  ঝাউবনের সারি এর পরেই মাছ ধরার ট্রলারের সারি আর সামনে বিশাল সমুদ্র আর বালু ফুড়ে অসংখ্য কাকড়ার ঘনবসতি। । এমন সুন্দর এক গ্রামীন পরিবেশ মুহুর্তের জন্য মন ভাল করে দেয়।

পাটুয়ারটেক বীচ থেকে তোলা

প্রায় ঘন্টা দুয়েক কাটালাম শামলাপুরে। ঝাউবনের নিচে হাত পা ছড়িয়ে বসে বসে খানিকক্ষণ উপভোগ করলাম সমুদ্রের রুপ আর গর্জন। রাতের বেলা টেন্ট করার জন্য জায়গাটা দারুন মনে হল, আর সিকিউরিটি নিয়েও কোন ঝামেলা হবে বলে মনে হল না। স্থানীয় দের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম মাঝে মাঝেই বড়সড় টুরিষ্ট গ্ররুপ এসে ক্যাম্প করে যায়।


ফিরতি পথে ইনানী থামতে চাইলাম, গাড়ির ড্রাইভার বলল পাটুয়ারটেক দেখার পর ইনানী বিচে যাওয়া মানে সময় নষ্ট তাই আবার পাটুয়ারটেক নামলাম ডাব খাপার জন্য, যাবার সময় বিশাল সাইজের ডাব দেখে গিয়েছিলাম কিন্তু দরদামে বনিবনা না হওয়ায় খাওয়া হয় নি । এবার খেলাম, এক এক টা ডাব একজনে শেষ করা কঠিন। তবে ফিরতি পথে পাটুয়ার টেক ভাল লাগল না টুরিষ্ট দিয়ে ভরে গেছে। তাই আর বেশী সময় নষ্ট করলাম না।

হোটেল ওশান ব্লু 

ইনানী বীচ থেকে একতু সামনে এগুলেই চোখে পড়ল ঝকঝকে হোটেল টি । সেনাবাহিনীর অর্থায়নে নির্মিত সুন্দর হোটেল টি একদম নিরিবিলি জায়গায় অবস্থিত বীচ লাগোয়া। এটার ব্যাবস্থাপক মামুন ভাইএর সাথে পরিচয় থাকার সুবাদে এটার ছাদ ঘুরে দেখার সুযোগ হল। পুরো কাজ শেষ হয়নি এখনো। তবে ছাদ থেকে সমুদ্র অনেক সুন্দর ভাবেই দেখা যায়। ছাদের একপাশে সাগর আর আরেকপাশে সারি সারি পানের বরজ। সব মিলিয়ে এই হোটেলের অবস্থানগত সোন্দর্য দেখার মত। 

হোটেল ব্লু ওশান এর ছাদ থেকে তোলা


হিম ছড়ির চুড়া থেকে তোলা। 

কক্সবাজার বেড়াতে গেলে কমবেশি সবাই হিমছড়ি ঘুরতে যায়। এর চুড়া থেকে সাগর দেখতে অসাধারন লাগে। 


৬ নং জাহাজ ঘাট

আমাদের তৃতীয় দিনের প্রোগ্রাম ছিল মহেশখালী। আর এখানে যাবার আয়োজনটা বেশ রোমাঞ্চকর। সমুদ্রের উপর দিয়ে স্পিড বোট বা ট্রলারে করে যাওয়াটা বেশ উপভোগ্য। কক্সবাজারের ৬ নং ঘাট থেকে মহেশখালীর উদ্দেশ্যে প্রতিদিন অসংখ্য ট্রলার , স্পিডবোট ছেড়ে যায়। আমরা যাবার সময় স্পিডবোটে গিয়েছিলাম আর ফিরতি পথে ট্রলার এ এসেছিলাম যাতে দুই বাহনের ই রোমাঞ্চ উপভোগ করতে পারি। 

মহেশখালি চ্যানেল। 

মহেশখালী মুলত দ্বিপ এলাকা হলেও এখানকার অর্থনৈতিক ব্যাবস্থা বেশ উন্নত। বিশেষ করে শুটকি পল্লী ও পর্যটন স্পট এর কারনে জায়গাটা বেশ সরগরম। স্পিডবোটে যাবার পথে বেশ রোমাঞ্চ অনুভব করছিলাম বিশেষ করে এটা যখন সাগরের মোহনা অতিক্রম করে , আবার এদিকে বোটের লোকেরা বলাবলি করছিল যে মাঝে মাঝেই নাকি বোট ডুবে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটে (যদিও এরকমটা আসলে হয় না সবসময়)। 

ডিজিটাল বাংলাদেশের ছোয়া সবখানে

যাইহোক, স্পিডবোটে জেটিতে নামার পর অটোরিকশা ড্রাইভার এর দল ঘিরে ধরল আমাদের। এদের ভেতর থেকে দরদাম করে ১ জন কে ১০০০টাকায় ঠিক করলাম সারাদিনের জন্য। সারাদিন বলতে যে ৫ টি মন্দির আছে সেটা সহ শুটকি পল্লী ও শুটিং স্পট ঘুরিয়ে দেখাবে আমাদের। 

প্রথমেই শুরু করলাম ঐতিহ্যবাহী আদিনাথ মন্দির দিয়ে, বেশ খাড়া সিড়ী বেয়ে অনেকটা উচুতে উঠতে হয় এই দৃষ্টীনন্দন এই মন্দিরের । 

                                                                  শ্রী শ্রী আদিনাথ মন্দির

                                                 আদিনাথ মন্দিরের একাংশ

আদিনাথ মন্দির থেকে নেমেই চলে গেলাম  শুটিং স্পট জেটীতে , এটা মুলত আদিনাথ মন্দিরের পাশেই অবস্থিত আর জেটির দৈঘ্য ১ কিমি তো হবেই । জেটির দু পাশে সারি সারি গাছ আর সামনে সমুদ্র চমৎকার একটা প্রশান্তি এনে দেয় মনে। 

                                                            মহেশখালী শুটিং স্পট জেটি

এরপর একে একে বাকি মন্দির ও শুটকি পল্লী ঘোরা শেষ করে চলে এলাম স্থানীয় বাজারে। অটোরিকশার ড্রাইভার পরামর্শ দিয়েছিল শুটকি পল্লী থেকে শুটকি না কিনে বাজার থেকে কেনার জন্য, কারন পল্লীর মাছ গুলো নাকি নিন্মমানের থাকে আর ভাল শুটকি গুলো বাজার হয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। 

                                                               মহেশখালী শুটিকি পল্লী

তবে সেই অটোদ্রাইভার এর কথা শুনে কিন্তু ঠকিনি , দাম একটু বেশি পড়েছে কিন্তু আমি পেয়েছিলাম সেরা মানের শুটকি। যদি আমাকে জিজ্ঞাস করা হয় দিত্বীয়বার কেন মহেশখালি যাবেন, আমি বলব অবশ্যই শুটকী কেনার জন্য। এখানের ফ্রেশ শুটকীর স্বাদ আমার মুখে লেগে আছে। 

                                                            মহেশখালীর আরো কিছু মন্দির                                    
    
                                                         মহেশখালীর আরো কিছু মন্দির  

                                                          মহেশখালীর আরো কিছু মন্দির  

                                                               মহেশখালীর আরো কিছু মন্দির  

                                                            মহেশখালীর আরো কিছু মন্দির  


চলবে..................

Comments

  1. Aussie Rules: Casino Rules for Fun - JTM Hub
    JAMMA HABANERO 춘천 출장안마 POKER 경기도 출장마사지 – Play the 군포 출장안마 poker or casino 군포 출장샵 game 서울특별 출장안마 that pays out for itself. Any wager placed on one of the house's cards (as opposed to

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

পায়ে হেটে প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন ভ্রমন !!

চাঁদপুর লঞ্চ ভ্রমন অথবা প্রকৃতির সাথে একমুঠো রোমান্স।।