ভার্জিন দ্বীপ চর তারুয়া, স্নিগ্ধতাই যার সম্বল

আজ থেকে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ বছর আগে বঙ্গোপসাগরের বুক চিরে জেগে ওঠে একটা চর । মনুষ্যবিহীন এই চরের আশে পাশে স্থানীয় জেলেরা মাছ ধরতে যেত আর তাদের জালে ধরা পড়ত ঝাকে ঝাকে তারুয়া মাছ , তখন থেকেই মানুষের মুখে মুখে এই দ্বীপের প্রচলন হয়ে যায় চর তারুয়া নামে।

চর তারুয়া সৈকত

বাংলাদেশের বৃহত্তম দ্বীপ ভোলা জেলার অনর্গত চরফ্যাশন উপজেলার সর্বদক্ষিনে অবস্থিত প্রায় ৭ কিমি দীর্ঘ এই দ্বীপের একদিকে বঙ্গোপসাগর আর অন্যদিকে চারনভুমি, রয়েছে ম্যানগ্রোভ বন। একদম শান্ত , নিরিবিলি আর নিরাপদ এই সৈকত ।

চরতারুয়া তে সুর্যাস্ত

ছোট্ট দ্বীপ বিধায় মানুষের বসবাস খুবই অল্প , মোবাইলের নেটওয়ার্ক ও তেমন নেই তবে স্থানীয়রা সোলার প্যানেল দিয়েই যাবতীয় কাজ চালিয়ে নেয়।

টুরিস্টদের জন্য এই এলাকার একমাত্র রিসোর্ট সোনিয়া রিসোর্ট , স্থানীয় ইউপি সদস্য'র তত্তাবধায়নে পরিচালিত এই রিসোর্টের সেবার মান আর আন্তরিকতা নিয়ে কোন ঘাটতি নেই।

সোনিয়া রিসোর্ট ও হাসনা হোটেল

রিসোর্ট এর ম্যানেজার স্থানীয় হাসান এখানেই থাকে পরিবার নিয়ে, রিসোর্ট লাগোয়া ছোট্ট হোটেলটি তার ই, মেয়ের নামে হোটেলের নামকরন করেছে হাসনা হোটেল। খাবারের মেনু সাগরের মাছ , কাকড়া, বাড়িতে নিজের হাতে করা শুটকি , নিজের পালা অর্হাগানিক হাস , মুরগি, ভেড়া । শুধু দেখিয়ে দেবেন কোনটা খেতে চান । বাকি ব্যাবস্থা সে নিজেই করে দেবে। তাদের রান্না করা প্রতিটা খাবার খেয়ে খুবই আনন্দ পেয়েছি।

এই মোরগ টা আমরা পছন্দ করেছিলাম রাতের খাবারের জন্য। 

আমরা একটা রুম নিয়েছিলাম এই রিসোর্ট এর, সাথে করে আনা ব্যাগ , ব্যাগেজ রাখার জন্য, রাতে তাবু করে ছিলাম সৈকত এ । ক্যাম্প ফায়ার করার জন্য জ্বালানী কাঠ এর অভাব নেই সৈকত এর আশেপাশের চারনভুমিতে। সৈকত ঘেষা ম্যাংগ্রোভ জঙ্গল থেকে শিয়াল মামারা রাতে ঘুরতে আসে সৈকতে তবে এতে ভয়ের কিছু নাই আগুন দেখলে ধারে কাছেই ঘেষে না এরা।

রাতে এখানেই ক্যাম্প করেছিলাম , জোয়ারের সময় পানি তাবুর একদম কাছাকাছি চলে এসেছিল

প্রানবৈচিত্রে ভরপুর একটা দ্বীপ, ভোরবেলা যখন হাটতে বের হলাম কত রকম নাম না জানা পরিযায়ী পাখির সাক্ষাত পেয়েছি তার হিসেব নেই । ঢাকা শহরে কাক আর তারুয়া তে বক যেন ডাল্ভাত।
একটা পাখি আটকে গিয়েছিল জালে, সেটাকে অবমুক্ত করার চেষ্টা চলছে

এখনাকার মানুষের প্রধান পেশা হল মাছ ধরা, সন্ধ্যা হলেই বেরিয়ে পড়ে ট্রলার নিয়ে আর ভোরে চলে আসে ঘাটে। নানারকম সামুদ্রিক মাছের সমাহার এই এলাকায় । চারনভুমি থাকায় এদিকে গরু ও মহিষের ও আনাগোনা প্রচুর । ভোলার ঐতিহ্যবাহী মহিষের তৈরি দই , মিস্টি আর দুধের তৈরি চা খাবার সৌভাগ্য হয়েছিল এবারের ট্যুর এ।

মহিষের দুধের চা 

মহিষের দুধ দিয়ে তৈরি মিষ্টি 

মহিষের দুধ দিয়ে তৈরি দই 

চর তারুয়া সৈকতের অন্যতম আকর্ষন হল লালকাকড়া, সকাল আর বিকাল এর একটা নিদৃষ্ট সময় ঝাকে ঝাকে লাল কাকড়া ছেয়ে যায় সৈকতে, তবে তাদেরকে ছবিতে ক্যাপচার করা খুবই দুরহ ব্যাপার, কারন উপস্থিতি টের পেলেই নিমেষে তারা গর্তে ঢুকে যায়। দূর থেকে যখন দেখছিলাম , মনে হচ্ছিল কেউ লাল কার্পেট বিছিয়ে রেখেছে।



এই এলাকার মানুষের ব্যাবহার, আপ্যায়ন , আতিথেয়তা সম্পর্কে আলাদা করে না বললেই নয় । তারা মনে প্রানেই চাইছে এই এলাকা উন্নত হোক , পর্যটকের আনাগোনা বাড়ুক। তাদের আপ্যায়ন আর আতিথেয়তাই বলে দেয় এটা।

ঢালচর দিয়ে গেলে পার হতে হবে এরকম রোমাঞ্চকর সাকো 

কিভাবে যাবেন চর তারুয়া ঃ
ঢাকা সদরঘাট থেকে রাত ৮ টার ভিতর ২-৩টা লঞ্চ ছেড়ে যায় বেতুয়ার উদ্দেশ্যে। সকাল ৬ টায় বেতুয়া নেমে সেখান থেকে রিকশায় চরফ্যাশন বাসস্টান্ড , এরপর সিএনজি করে পাচ-কপাটি ঘাট। দুই ভাবে যাওয়া যায় চরতারুয়া তে।
ঢালচর ঘাট , এই ট্রলারেই পাড়ি দিতে হয় ঘন্টার পথ

চাইলে চরফ্যাশন থেকে সরাসরি কচ্ছপিয়া ঘাট আর সেখান থেকে স্পিডবোটে করে সরাসরি চরতারুয়া অথবা পাচকপাটি ঘাট থেকে ট্রলারে করে ঢালচর , আর সেখান থেকে বাইকে করে চর তারুয়া। আমার কাছে পাচকপাটি ঘাট এর অপশন টা বেশি এক্সাইটিং লেগেছে।
ঢালচর ঘাটের একাংশ 

প্রতিদিন সকাল ৯ টায় ১ টা ট্রলার ছেড়ে যায় পাচকপাটি ঘাট থেকে আর দুপুর ৩ টাইয় ছেড়ে আসে ঢালচর থেকে । ১.৩০ থেকে ২.০০ ঘন্টার এই ট্রলার জার্নিটা দারুন উপভোগ্য।


Comments

Popular posts from this blog

পায়ে হেটে প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন ভ্রমন !!

চাঁদপুর লঞ্চ ভ্রমন অথবা প্রকৃতির সাথে একমুঠো রোমান্স।।

পরিবার পরিজন নিয়ে কক্সবাজার।